জুলাই থেকে তিন ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামোর (পে-স্কেল) আংশিক বাস্তবায়ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে শুরু হতে পারে বলে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাজেটের ওপর চাপ কম রাখতে পুরো কাঠামো একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করে তিন ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হবে, পরবর্তী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হতে পারে এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ধাপে ধাপে বিভিন্ন ভাতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে একদিকে সরকারি কর্মচারীরা দ্রুত আংশিক আর্থিক সুবিধা পাবেন, অন্যদিকে সরকারের ওপর এককালীন ব্যয়ের চাপও তুলনামূলকভাবে কম থাকবে। নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি বেতন কমিশন গঠন করে। গত ২২ জানুয়ারি জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন ধাপে বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ধাপে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় জানান, সুপারিশ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তা বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি প্রক্রিয়া রয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রধান করে ১০ সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিই তিন ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। জানা গেছে, বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গেলে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।

বেসামরিক কর্মচারীদের পাশাপাশি জুডিসিয়াল সার্ভিস এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও পৃথক বেতন কাঠামোর প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে। এই তিনটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ জমা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বের উচ্চপর্যায়ের কমিটি। সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নের জন্যই বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রয়োজন হতে পারে।

প্রস্তাবিত কাঠামোয় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হলেও বর্তমানের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ১:৯ দশমিক ৪। সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ও সিনিয়র সচিবদের জন্য বিদ্যমান ২০ ধাপের বাইরে আলাদা বেতনধাপ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে, যা পরে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি হতে পারে।

অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও পরে সময় বাড়ানো হয় এবং নির্ধারিত সময়সীমার তিন সপ্তাহ আগেই কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য, মূল্যস্ফীতি, প্রতিবেশী দেশের বেতন কাঠামো, বেসরকারি খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোতে মূল বেতন বাড়লে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং যাতায়াত ভাতা ১১তম থেকে ২০তম ধাপের পরিবর্তে ১০ম থেকে ২০তম ধাপ পর্যন্ত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

পেনশনভোগীদের জন্যও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে মাসিক ২০ হাজার টাকার কম পেনশনপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি হতে পারে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশনে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনে প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতাও নির্ধারণ করা হয়েছে—৭৫ বছরের বেশি হলে ১০ হাজার টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা। এছাড়া উচ্চ বেতনের প্রথম থেকে দশম ধাপের কর্মচারীদের তুলনায় ১১তম থেকে ২০তম ধাপের কর্মচারীদের জন্য বাড়িভাড়া ভাতা বেশি হারে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

About Author

Check Also

কৃষকের সার ও পানি সমস্যার সমাধান চান ডিসিরা

সার ও পানি সমস্যার সমাধান চেয়েছেন জেলা প্রশাসকেরা (ডিসি)। ডিসি সম্মেলনে তারা বলেছেন, উৎপাদন করতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *